|

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম ও নিয়ত [সময়, রাকাত] A to Z শিখুন

ইসলামে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তো প্রতিটি মুসলমানের জন্যই ফরজ, যা আমাদের ঈমানের ভিত্তি! কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এমন কোন বিশেষ ইবাদত আছে কি যা আমাদেরকে আমাদের প্রভুর সবচেয়ে কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে?

হ্যাঁ, আছে!
আর সে ইবাদত হলো তাহাজ্জুদঃ
গভীর রাতের সেই নামাজ, যা শুধু পাপই মোচন করে না, বরং আমাদের হৃদয়ের লুকিয়ে থাকা একান্ত ইচ্ছাগুলো পূরণেরও এক বিশেষ করে উপায়।

আমরা জানি! আপনাদের মনেও তাহাজ্জুদ সম্পর্কিত অনেক প্রশ্ন যেমন:

  • তাহাজ্জুদের সঠিক সময় ও রাকাত কত?
  • সহজ ও নির্ভুলভাবে তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম ও নিয়ত কি?
  • তাহাজ্জুদ নামাজের সময় কোন দোয়া পড়লে মনের ইচ্ছা পূরণ হয়?

আপনাদের এই সকল প্রশ্নের উত্তর দিতেই আমাদের এই বিশেষ আয়োজন! এখানে আমরা কোন জটিল আলোচনা ছাড়াই, কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে প্রতিটি বিষয় সহজভাবে তুলে ধরেছি, যেন আপনারা আজ রাত থেকেই এই বরকতময় ইবাদত শুরু করতে পারেন।

তাহাজ্জুদ নামাজ – صلاة التهجد

صلاة التهجد এটি আরবি শব্দ, যাকে قيام الليل (রাতের নামাজ) বলা হয়, যার অর্থ — “রাত জাগা” বা “রাতের ইবাদত করা।”
তাহাজ্জুদ নামাজ ঐচ্ছিক ইবাদত (نَافِلَة)، কারণ এটি পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের মতো প্রতিদিন আদায় করা আবশ্যক নয়।

তবে কেউ চাইলে قُرْبُ الله (প্রভুর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে) প্রতিদিন এ-সালাত আদায় করতে পারে।

তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত

কোরআনের ভাষায়ঃ-

وَ مِنَ الَّیۡلِ فَتَهَجَّدۡ بِهٖ نَافِلَۃً لَّكَ ٭ۖ عَسٰۤی اَنۡ یَّبۡعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحۡمُوۡدًا ﴿۷۹﴾
“রাতের কিছু অংশে জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় কর; এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত (ইবাদত)। আশা করা যায় তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।”— সূরা আল-ইসরা: ৭৯

وَ بِالۡاَسۡحَارِ هُمۡ یَسۡتَغۡفِرُوۡنَ ﴿۱۸﴾
“রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে।”— সূরা আয-যারিয়াত: ১৮

রাসূল (ﷺ) এর ভাষায়ঃ—

বিলাল (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ( সাঃ) বলেছেনঃ
তোমরা তাহাজ্জুদ বা রাতের নামাজ আদায় করো, কারণ এটি তোমাদের পূর্ববর্তী সৎ লোকদের অভ্যাস ছিল। এটি আল্লাহর নিকট যাওয়ার মাধ্যম, পাপ থেকে বিরত রাখে, গুনাহ মোচন করে এবং শরীরের রোগ দূর করে। তিরমিজি: ৩৫৪৯

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাতের শেষ অংশে আমাদের রব নেমে আসেন এবং বলেন, কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার দোয়া কবুল করব; কে আছে যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব; কে আছে যে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব। সহিহ বুখারী: ১১৪৫, সহিহ মুসলিম: ৭৫৮

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিতঃ
ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ। সহিহ মুসলিম: ১১৬৩

তাহাজ্জুদ নামাজের সময়

تَهَجُّد নামাজের সময় হলো এশার নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত।
তবে এর উত্তম সময় হলো ثُلث الليل الأخير (রাতের শেষ তৃতীয়াংশে)!—যদি রাতে উঠা সম্ভব না হয়, তবে এশার নামাজের পরও তাহাজ্জুদ আদায় করা যায়।

তাহাজ্জুদ নামাজের রাকাত সংখ্যা

তাহাজ্জুদ নামাজের রাকাত সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়।
রাসূল (সাঃ) কখনো রাকাত, কখনো তার বেশি বা কমও পড়েছেন।
তাই সাধ্য অনুযায়ী ২, ৪, ৬, ৮, ১০, এমনকি ১২ রাকাতও আদায় করতে পারেন।

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত || Tahajjud Namaz Niyat

“নিয়ত” মানে— সংকল্প বা মনের ইচ্ছা।
অর্থাৎ, আপনি যে নামাজেই পড়েন না কেন সে নামাজের ইচ্ছা করাই সে নামাজের নিয়ত! এবং সাথে সাথে কত রাকাত পড়বেন, সেটা নির্ধারণ করে নিবেন।

বিঃদ্রঃ তাহাজ্জুদ নামাজের আরবি/বাংলা উচ্চারণসহ নিয়ত দেওয়ার পূর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা প্রয়োজন —
ওলামায়ে কেরামদের মতে, আমরা যারা বিশুদ্ধ আরবি উচ্চারণ জানি না, তাদের জন্য বাংলা ভাষায় নিয়ত করা উত্তম

কারণ নামাজের ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত জরুরি, এবং সেই নিয়ত সঠিকভাবে করা আরও জরুরি
তাই যে ভাষায় মন ও মুখ দিয়ে স্পষ্টভাবে নিয়ত করা যায়, সেই ভাষায় নিয়ত করাই শ্রেয়।

তাহাজ্জুদ নামাজের আরবি নিয়ত

نَوَيْتُ أَنْ أُصَلِّيَ لِلّٰهِ تَعَالَى رَكْعَتَيْ صَلَاةِ التَّهَجُّدِ سُنَّةَ رَسُولِ اللّٰهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا إِلَى جِهَةِ كَعْبَةِ الشَّرِيفَةِ، اللّٰهُ أَكْبَرُ

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত আরবিতে বাংলা উচ্চারণ

নাওয়াইতোয়ান উছললিয়া লিল্লাহি তায়া’লা রক’আতাই সলাতিত তাহাজ্জুদি, সুন্নাতু রসুলিল্লাহি তায়া’লা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতি কা’বাতিশ সারিফাতি —আল্লাহু আকবার

তাহাজ্জুদ নামাজের বাংলা নিয়ত

আমি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ২’রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করছি। —আল্লাহু আকবার

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম

তাহাজ্জুদ নামাজ অন্যান্য নামাজের মতোই আদায় করা হয়, কেবল নিয়ত আলাদা। যেহেতু তাহাজ্জুদ নফল নামাজ, তাই ২ কিংবা ৪ রাকাত করেও এটি আদায় করা যায়।
নিম্নে পূর্ণাঙ্গ তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম দেওয়া হলো; আমাদের দেওয়া স্টেপগুলো ফলো করে, সহজেই আপনি বিশুদ্ধভাবে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা শিখতে পারবেন, ইনশাল্লাহ।

১.প্রস্তুতি

  • নামাজের আগেপবিত্রতা/ওযু নিশ্চিত করুন
  • পবিত্র স্থান কিংবা জায়নামাজ বিছান এবং মুখ কিবলা দিকে করুন।

২.নিয়ত করুন

  • মনে মনে সংকল্প করুন যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ছি
  • উদাহরণ নিয়তঃ
    • আমি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ২’রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করছি।

৩.তকবিরে তাহরীমা (নামাজ শুরু করা)

  • দুই হাতে কান স্পর্শ করে বলুন: “আল্লাহু আকবর”

৪.সানা, আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ুন

  • (سُبْحَانَكَ اللّٰهُمَّ) পুরোটা পড়ুন
  • أَعُوذُ بِاللّٰهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
  • بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

৫.কেরাত পড়ুন

  • সুরা ফাতিহা পড়ুন।
  • এরপর ১টি সূরা বা কয়েকটি আয়াত পড়ুন যেমনঃ
    • আল-ইখলাস, ফালাক, নাস।

৬.রুকু

  • বলুন: “আল্লাহু আকবর”
  • ধীরে কোমর ভেঙে রুকু করুন, পিঠ সরল রাখুন।
  • বলুন: “سبحان ربي العظيم”
    • বার/বার কিংবা বার
  • তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ান।

৭.সিজদা (মাটিতে মাথা রাখা)

  • বলুন: “আল্লাহু আকবর”
  • মাথা, নাক, হাত, হাঁটু ও পায়ের আঙুল মাটিতে রাখুন।
  • বলুন: “سبحان ربي الأعلى”
    • বার/বার কিংবা বার
  • এরপর বসে আবার দ্বিতীয় সিজদা করুন।

৮.দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানো

  • দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ান।
  • প্রথম রাকাতের মতো বিসমিল্লাহ সহ সহ ফাতিহা + ১টি সূরা/কয়েকটি আয়াত পড়ুন।
  • পূর্বের নিয়ম অনুসারে রুকু ও সিজদা সম্পন্ন করুন।

৯.শেষ বৈঠক

  • সেজদা সম্পন্ন করে সোজা হয়ে বসুন।
  • বসে তাশাহুদ/ দরুদ শরীফ/ দোয়ায়ে মাসুরা পড়ুন।
    • اَلتَّحِيَّاتُ
    • اللّٰهُمَّ صَلِّ عَلى
    • اللّٰهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي

১০.সালাম দিয়ে নামাজ শেষ করা

  • ডান দিকে বলুন: “السلام عليكم ورحمة الله”
  • তারপর বাম দিকে বলুন: “السلام عليكم ورحمة الله”

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

পুরুষ এবং মহিলাদের জন্য তাহাজ্জুদের নামাজের নিয়ম কি এক?

পুরুষ ও মহিলাদের নামাজের নিয়ম একই, শুধু কয়েকটি কাইফিয়াতগত ভিন্নতা রয়েছে। বাকী সব নিয়ম সম্পূর্ণ এক।

তাহাজ্জুদ নামাজ কত রাকাত

তাহাজ্জুদ নামাজ ৪ থেকে ১২ রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়। রাসূল সাঃ ৮ রাকাত পড়তেন তাই এটাই উত্তম। 

Similar Posts

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।